পাশাপাশি করপোরেট করহার ২৫ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। অন্যদিকে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বর্তমান করহার থেকে ২০ শতাংশ ছাড় এবং টেক্সটাইল খাতের কর পুনরায় ১৫ শতাংশ করার সুপারিশ করেছে জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার।
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে সামনে রেখে গতকাল রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব প্রস্তাব উত্থাপন করে জেবিসিসিআই। চেম্বারের সভাপতি তারেক রফি ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন মহাসচিব মারিয়া হাওলাদার; সাবেক সভাপতি মতিউর রহমান, সুগাওয়ারা মানাবু ও আসিফ এ চৌধুরীসহ সংগঠনের সহসভাপতি মো. আনোয়ার শহীদ।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, অনেক দেশ প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের জন্য নিম্ন করপোরেট কর ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। অথচ বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে উচ্চ করের বোঝা শিল্প সম্প্রসারণ এবং মূলধন প্রবাহকে নিরুৎসাহিত করছে। জেবিসিসিআই বলেছে, আসন্ন জাতীয় বাজেটে শুধু রাজস্ব আদায়ের ওপর মনোযোগ না দিয়ে প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ এবং রাজস্ব ব্যবস্থার আধুনিকীকরণকে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত।
সংগঠনটি জানিয়েছে, একটি সরলীকৃত ও একীভূত ভ্যাট কাঠামো ব্যবসা করার সুবিধা বাড়াবে। বিশেষ করে এসএমই এবং উদীয়মান শিল্পগুলো এর সুফল পাবে। এছাড়া অতিরিক্ত অগ্রিম বা ন্যূনতম কর ব্যবস্থার পরিবর্তে প্রাথমিকভাবে নিট লাভের ওপর ভিত্তি করে কর নির্ধারণ হওয়া উচিত বলে মনে করছে জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার। তারা লোকসানি ব্যবসার জন্য মোট প্রাপ্তির ওপর ভিত্তি করে ন্যূনতম কর এবং উৎসে করের বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে।
সংগঠনটি শিল্প কাঁচামাল, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জাম, স্বাস্থ্যসেবা পণ্য, অটোমোবাইল, ইস্পাত, সিমেন্ট এবং উৎপাদন উপকরণের ওপর শুল্ক (সিডি), নিয়ন্ত্রক শুল্ক (আরডি), ভ্যাট, অগ্রিম কর (এটি) এবং অগ্রিম আয়কর (এআইটি) কমানোর সুপারিশ করেছে। এছাড়া প্রযুক্তি হস্তান্তর সহজতর এবং বিদেশী বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বিদেশী কারিগরি ও পেশাদারি সেবার ওপর প্রযোজ্য উৎসে কর হ্রাসের আহ্বান জানিয়েছে।
অনুষ্ঠানে চেম্বারের সভাপতি তারেক রফি ভূঁইয়া টেক্সটাইল খাতে করহার পুনরায় ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবি জানান। তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট ও মূল্যচাপের মধ্যে টেক্সটাইল খাতে বিদ্যমান করহার শিল্পটির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। এ কারণে রফতানি সক্ষমতা ধরে রাখা, পুনর্বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং কর্মসংস্থান সুরক্ষায় আমরা খাতটির করহার আবার ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনার সুপারিশ করেছি।’
তিনি আরো বলেন, ‘বর্তমানে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, জ্বালানি ও লজিস্টিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং জটিল কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থার কারণে চাপে রয়েছে। এ অবস্থায় বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশকে আরো স্থিতিশীল, পূর্বানুমানযোগ্য ও বিনিয়োগবান্ধব কর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।’ বিলম্বিত ভ্যাট রিফান্ড সরাসরি ব্যবসার কার্যকর মূলধন, পরিচালন কার্যক্রম ও বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে বলেও উল্লেখ করেন জেবিসিসিআই সভাপতি।
চেম্বারের সাবেক সভাপতি মতিউর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনার উচ্চ ব্যয় ও জটিল আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বিনিয়োগ প্রবাহে বড় বাধা তৈরি করছে।’ তিনি কর, কাস্টমস ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
মতিউর রহমান আরো বলেন, ‘কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প, টেক্সটাইল ও অটোমোবাইল খাতকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি ৫-১০ বছরের সময়ভিত্তিক স্পষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে।’
জেবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি সুগাওয়ারা মানাবু বলেন, ‘কর রাজস্ব শুধু আহরণ নয়, এর ব্যয়ও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত অবকাঠামো, বন্দর, কাস্টমস, সড়ক যোগাযোগ এবং বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যাতে শিল্প ও উৎপাদন কার্যক্রম আরো দক্ষভাবে পরিচালিত হয়।’
সংগঠনেরর সাবেক সভাপতি আসিফ এ চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশের লজিস্টিকস খরচ এবং বন্দরের অদক্ষতা, ব্যবসার ব্যয়-সময় বাড়িয়ে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমাচ্ছে।’ তিনি চট্টগ্রাম বন্দরের জট, কাস্টমস জটিলতা ও নীতিগত অনিশ্চয়তা দূর করে ডিজিটালাইজেশন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সমন্বিত নীতি গ্রহণের আহ্বান জানান।
জেবিসিসিআই মহাসচিব মারিয়া হাওলাদার বলেন, ‘বাজেটকে ঘিরে করপোরেট কর ২৫ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ করার পাশাপাশি টিডিএস ও ন্যূনতম কর সংস্কার, ভ্যাট ও কর রিফান্ড সহজীকরণ এবং কর প্রশাসনের ডিজিটালাইজেশনের প্রয়োজন রয়েছে।’ পাশাপাশি কর অব্যাহতির জটিলতা দূর করে নীতিগত সমন্বয় ও বিনিয়োগবান্ধব স্থিতিশীল কর কাঠামো গঠন জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।